বাংলাদেশ , বুধবার, ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০২০

মহানবী হযরত মুহাম্মদ রাসুল (সা.) ছিলেন পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ শিক্ষক

লেখক : সম্পাদক | প্রকাশ: ২০২০-০১-২৪ ১৬:১৭:৪৮

রাসুল (সা.) ছিলেন পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ শিক্ষক। তিনি বিভিন্ন সময় স্বীয় সাহাবাদের বিভিন্ন বিষয়ে উপদেশ দিয়েছেন। তেমন একজন সাহাবি মুআজ (রা.)। একবার রাসুল (সা.) তাঁকে ১০টি উপদেশ দিয়েছিলেন।

১. ‘আল্লাহর সঙ্গে কাউকে শরিক করবে না, যদিও তোমাকে হত্যা করা হয় অথবা আগুনে জ্বালিয়ে দেওয়া হয়।’ শিরক অন্তত জঘন্য অপরাধ। মহান আল্লাহ পবিত্র কোরআনের অসংখ্য জায়গায় বান্দাকে শিরকের ব্যাপারে সতর্ক করেছেন এবং শিরক থেকে বেঁচে থাকার আদেশ করেছেন। ইরশাদ হয়েছে, তোমরা ইবাদত করো আল্লাহর, তাঁর সঙ্গে কোনো কিছুকে শরিক কোরো না। (সুরা : নিসা, আয়াত : ৩৬)

শিরক অমার্জনীয় অপরাধ। মহান আল্লাহ শিরককারীকে ক্ষমা করেন না। মহান আল্লাহ বলেন, নিশ্চয়ই আল্লাহ তাঁর সঙ্গে শরিক করাকে ক্ষমা করেন না। (সুরা : নিসা, আয়াত : ৪৮) তাই আমাদের উচিত শিরক থেকে মুক্ত থাকার সর্বোচ্চ চেষ্টা করা। এমন কাজ বর্জন করা, যাতে শিরকের আশঙ্কা থাকে।

২. ‘পিতা-মাতার অবাধ্য হবে না, যদি মাতা-পিতা তোমাকে তোমার পরিবার-পরিজন বা ধনসম্পদ ছেড়ে দেওয়ার হুকুমও দেয়।’ পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, তোমার রব ফায়সালা করে (আদেশ) দিয়েছেন, তিনি ছাড়া অন্য কারোর ইবাদত না করতে ও মাতা-পিতার সঙ্গে সদ্ব্যবহার করতে। তাদের একজন বা উভয়েই তোমার কাছে বার্ধক্যে উপনীত হলে তাদের ‘উফ্’ বলো না এবং তাদের ধমকও দিয়ো না। বরং তাদের সঙ্গে সম্মানসূচক কথা বলো। (সুরা : বনি ইসরাঈল, আয়াত : ২৩)

আলোচ্য আয়াতে এক আল্লাহর ইবাদতের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এর পরেই মাতা-পিতার সঙ্গে সদ্ব্যবহারের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এর কারণ হলো, মহান আল্লাহ মানুষের প্রকৃত স্রষ্টা ও প্রতিপালক। কিন্তু মানুষ পৃথিবীতে আসার বাহ্যিক উপায় ও মাধ্যম হলেন মাতা-পিতা। তাই আল্লাহর ইবাদতের নির্দেশনার পরেই মাতা-পিতার প্রতি কৃতজ্ঞ হওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

রাসুল (সা.) ইরশাদ করেছেন, তিন ধরনের মানুষের দিকে আল্লাহ তাআলা কিয়ামতের দিন দৃষ্টিপাত করবেন না। মাতা-পিতার অবাধ্য, পুরুষের সদৃশ অবলম্বনকারী নারী এবং দাইয়ুস। আর তিন প্রকার লোক জান্নাতে যাবে না। মাতা-পিতার অবাধ্য, মদ পানে আসক্ত এবং অনুদানের পর খোঁটাদাতা।’ (মুসনাদ আহমদ, হাদিস নম্বর : ৬১১)

৩. ‘ইচ্ছাকৃতভাবে কখনো কোনো ফরজ নামাজ ছেড়ে দিয়ো না। কারণ যে ব্যক্তি ইচ্ছাকৃতভাবে ফরজ নামাজ পরিত্যাগ করে, আল্লাহ তাআলা তার থেকে দায়িত্ব উঠিয়ে নেন।’ অর্থাৎ নামাজ বর্জনকারী আল্লাহর নিয়ামত, বরকত ও রহমত থেকে বঞ্চিত হবে। আল্লাহর ফেরেশতারা তার প্রতি অসন্তুষ্ট হন, তার দোয়া কবুল হয় না, তার চেহারার নূর উঠে যায়, তার জীবিকা সংকীর্ণ করা হয়।

ফলে সে ক্ষুধা ও তৃষ্ণায় কষ্ট পায়। রাসুল (সা.) ফরজ নামাজ বর্জনকারীর ব্যাপারে কঠিন হুঁশিয়ারি বাক্য উচ্চারণ করেছেন, জাবির (রা.) থেকে বর্ণিত, আমি রাসুল (সা.)-কে বলতে শুনেছি, বান্দা এবং শিরক ও কুফরের মধ্যে পার্থক্য হচ্ছে নামাজ ছেড়ে দেওয়া। (মুসলিম, হাদিস : ১৪৮) তাই কোনো মুসলিম ইচ্ছাকৃত ফরজ নামাজ ত্যাগ করতে পারে না।

৪. ‘মদ পান থেকে বিরত থাকবে। কেননা তা সব অশ্লীলতার মূল।’ মাদক শুধু ব্যক্তিকে নয়, তার গোটা পরিবারকে ধ্বংস করে দেয়। সমাজে তাদের মাথা নিচু করে দেয়। মানুষকে অশ্লীলতার দিকে ঠেলে দেয়। এ ধরনের অভ্যাস জীবনের সফলতার অন্তরায়। যারা এগুলো ত্যাগ করতে পারে না তারা সফল হতে পারে না। পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘হে মুমিনগণ, নিশ্চয় মদ, জুয়া, প্রতিমা-বেদি ও ভাগ্যনির্ধারক তীরসমূহ তো নাপাক শয়তানের কর্ম। সুতরাং তোমরা তা পরিহার করো, যাতে তোমরা সফলকাম হও।’ (সুরা : মায়েদা, আয়াত : ৯০)

৫. ‘সাবধান! আল্লাহর নাফরমানি ও গুনাহ থেকে বেঁচে থাকো, কেননা নাফরমানি দ্বারা আল্লাহর ক্রোধ অবধারিত হয়ে যায়।’ মহান আল্লাহ ইরশাদ করেন, ‘তোমরা প্রকাশ্য ও গোপন পাপ বর্জন করো, যারা পাপ করে অচিরেই তাদের পাপের সমুচিত শাস্তি দেওয়া হবে।’ (সুরা : আনআম, আয়াত : ১২০)

৬. ‘জিহাদ থেকে কখনো পালিয়ে যাবে না, যদিও সব লোক মারা যায়।’ পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ ইরশাদ করেছেন, নিশ্চয়ই আল্লাহ মুমিনদের থেকে তাদের জান ও মাল ক্রয় করে নিয়েছেন (এর বিনিময়ে) যে তাদের জন্য রয়েছে জান্নাত। তারা আল্লাহর পথে লড়াই করে। অতএব তারা মারে ও মরে। তাওরাত, ইঞ্জিল ও কোরআনে এ সম্পর্কে সত্য ওয়াদা রয়েছে। আর নিজ ওয়াদা পূরণে আল্লাহর চেয়ে অধিক কে হতে পারে? সুতরাং তোমরা (আল্লাহর সঙ্গে) যে সওদা করেছ, সে সওদার জন্য আনন্দিত হও এবং সেটাই মহাসাফল্য। (সুরা : তাওবা, আয়াত : ১১১)

৭. ‘যখন মানুষের মধ্যে মহামারি ছড়িয়ে পড়ে আর তুমি সেখানেই রয়েছ, তখন সেখানে তুমি অবস্থান করবে (পলায়নপর হবে না)।’ মহামারি প্রসঙ্গে রাসুল (সা.) আলোচনা করলেন এবং বললেন, যে গজব বা শাস্তি বনি ইসরাঈলের এক গোষ্ঠীর ওপর এসেছিল, তার বাকি অংশই হচ্ছে মহামারি। অতএব, কোথাও মহামারি দেখা দিলে এবং সেখানে তোমরা অবস্থানরত থাকলে সে জায়গা থেকে চলে এসো না। অন্যদিকে কোনো এলাকায় এটা দেখা দিলে এবং সেখানে তোমরা অবস্থান না করলে সে জায়গায় যেয়ো না। (তিরমিজি, হাদিস : ১০৬৫)

৮. ‘শক্তি-সামর্থ্য অনুযায়ী নিজের পরিবার-পরিজনের জন্য খরচ করবে (কার্পণ্য করে তাদের কষ্ট দেবে না)।’ কৃপণতা মুমিনের বৈশিষ্ট্য নয়। কোনো মুমিন কৃপণ হতে পারে না। আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, আমি রাসুল (সা.)-কে বলতে শুনেছি, যে ব্যক্তির চরিত্রে কৃপণতা, ভীরুতা ও হীন মানসিকতা রয়েছে সে খুবই নিকৃষ্ট। (আবু দাউদ, হাদিস : ২৫১১)

৯. ‘পরিবারের লোকেদের আদব-কায়দা শিক্ষার জন্য কখনো শাসন হতে বিরত থাকবে না।’ রাসুল (সা.) বলেছেন, সাবধান! তোমরা সবাইকে রাখাল (দায়িত্বশীল) এবং তোমাদের প্রত্যেককেই তার রাখালি (দায়িত্ব পালন) প্রসঙ্গে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে। (তিরমিজি, হাদিস : ১৭০৫) তাই পরিবারের লোকদের সর্বাবস্থায় আল্লাহর হুকুম পালনে উদ্বুদ্ধ করতে হবে। প্রয়োজনে শাসন করতে হবে। সব পাপ কাজ বিরত রাখার চেষ্টা করতে হবে।

১০. ‘আল্লাহ তাআলা সম্পর্কে তাদেরকে ভয় প্রদর্শন করতে থাকবে।’ পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, আর তুমি তোমার নিকটাত্মীয়দের সতর্ক করো। (সুরা : শুআরা, আয়াত : ২১৪) এই আয়াত নাজিল হওয়ার পর রাসুল (সা.) বললেন, হে সাফিয়্যা বিনতু আবদিল মুত্তালিব, হে ফাতিমা বিনতু মুহাম্মদ, হে আবদুল মুত্তালিবের বংশধর! আল্লাহ তাআলার (পাকড়াও) হতে তোমাদেরকে বাঁচানোর ক্ষমতা আমার নেই। (তিরমিজি, হাদিস : ২৩১০)

Print Friendly, PDF & Email